Comjagat.com-The first IT magazine in Bangladesh
  • ভাষা:
  • English
  • বাংলা
হোম > লেখা > স্বাস্থ্যসেবায় আইসিটি
লেখক পরিচিতি
লেখকের নাম: গোলাপ মুনীর
মোট লেখা:১৫০
লেখা সম্পর্কিত
পাবলিশ:
২০১২ - ফেব্রুয়ারী
তথ্যসূত্র:
কমপিউটার জগৎ
লেখার ধরণ:
সাস্থ
তথ্যসূত্র:
রির্পোট
ভাষা:
বাংলা
স্বত্ত্ব:
কমপিউটার জগৎ
রেটিং: ০ মন্তব্য:০
স্বাস্থ্যসেবায় আইসিটি

বাংলাদেশ তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি তথা আইসিটি ব্যবহার করে এর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করতে পারত। তবে এর জন্য প্রয়োজন ছিল সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রদর্শন এবং প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা। গত ৬-৭ জানুয়ারি এ উচ্চারণ ছিল সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে। ঢাকায় দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞ বক্তাদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ‘স্বাস্থ্যসেবায় আইসিটি’ শীর্ষক এক আলোচনা-সমাবেশে এরা এই তাগিদী বক্তব্য রাখেন। এতে জানানো হয়, এরই মধ্যে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কিছু আইসিটিভিত্তিক বেসরকারি ও এনজিও উদ্যোগ সূচিত হয়েছে এবং এতে উল্লেখযোগ্য সাফল্যও পাওয়া গেছে। অপরদিকে দু’টি বড় সরকারি সংস্থা- স্বাস্থ্য অধিদফতর ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ বাস্তবায়ন করছে সংশ্লিষ্ট দু’টি পাইলট প্রকল্প।

বক্তারা এই আলোচনা-সমাবেশের সূচনা অধিবেশনে আরো বলেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য আইসিটি সুযোগ এনে দিয়েছে রোগীদের প্রচলিত সেবা যোগানোর বাইরে সমাজে সহজেই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় নিজেদের সংশ্লিষ্ট করতে। রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর রোগীর রোগ সারানোর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ধারণা যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যবস্থায় শুধু সচ্ছল মানুষই স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু মোবাইল ফোনের মতো আইসিটি পণ্য ব্যবহার করে সমাজের সবার কাছে পৌঁছে মানুষের আচরণগত পরিবর্তন এনে রোগ প্রতিরোধ নিশ্চিত করা সম্ভব। প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্যকর্মী কিংবা অনুজ পেশাজীবীরাও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সাথে সেলফোনে পরামর্শ নিতে পারেন। এরা তখন চিকিৎসকের পরামর্শ প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীকে জানিয়ে দিতে পারেন।

এ আলোচনা-সমাবেশে বিবেচ্য বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত ছিল : টেলিমেডিসিন, টেলিহেলথ, মোবাইল হেলথ, পেশেন্ট রেকর্ড ম্যানেজমেন্ট ও হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট। আলোচনা সমাবেশের বাইরে সেখানে বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে এমন প্রযুক্তি প্রদর্শনেরও আয়োজন ছিল। এই প্রদর্শন আয়োজনে অংশ নেয় গ্লোবাল মেড, লাইফসাইজ/লাইফপ্রেজেন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রামীণ ক্যালেডোনিয়াম নার্সিং হোম, ডি-নেট ও এম পাওয়ার।

দু’দিনব্যাপী এই আয়োজনের প্রথম দিন একটি সাধারণ সূচনা অধিবেশনসহ আরো ৬টি বিষয়ভিত্তিক কারিগরি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় দিনে তিনটি কারিগরি অধিবেশন শেষে অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ সমাপ্তি অধিবেশন। এই আয়োজনের সাথে বিভিন্নভাবে সংশ্লিষ্ট ছিল ডেইলি স্টার, গোল্ডেন হার্ভেস্ট, সামিট গ্রুপ, সিটি ব্যাংক, ডি-নেট এবং লাইফসাইজ। আয়োজকদের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি তিনটি বিষয় শেখার সুযোগ নেয়ার আহবান জানানো হয় : ০১. কী করে স্বাস্থ্যসেবা গরিবদের দোরগোড়ায় নিয়ে পৌঁছাতে হয়; ০২. কী করে প্রযুক্তি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় বিপ্লব এনে দিতে পারে এবং ০৩. কী করে বাংলাদেশ এর স্বাস্থ্যসেবায় আইসিটির ব্যবহারের সম্প্রসারণ ঘটিয়ে চলেছে।



প্রথম দিনের সূচনা পর্বের সাধারণ অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্য রাখতে গিয়ে ডেইল স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন- বাংলাদেশ বিগত বছরগুলোতে বেশ কিছু ইতিবাচক অর্জন হাতে পেয়েছে। একই সাথে অনেক কিছুই ঘটে চলেছে। বিশ্ব প্রযুক্তিবাজারে আসছে অনেক নতুন প্রযুক্তি, যা এখনো বাংলাদেশী উদ্যোক্তা ও নীতি-নির্ধারকের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ পাশ্চাত্য থেকে অনেক কিছুই শিখতে পারে। মন্দ ছেড়ে ভালোটি গ্রহণ করতে পারে। প্রযুক্তি সে সুযোগ এনে দিয়েছে।

এ পর্বে মূল বক্তা ছিলেন অশোকা ফেলো ও গ্লোবাল হেলথ অ্যান্ড টেকনোলজির সিনিয়র অ্যাডভাইজার ডেভিড অ্যাইলওয়ার্ড। তিনি বলেন, বিশ্বে ৩৫ শতাংশ মা ও শিশুর মৃত্যুর কারণ পুষ্টিহীনতা। বিশ্বব্যাপী মা ও শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে যে উদ্বেগ, বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এসব সমস্যার কারণে একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপির হার ২ শতাংশ কমে যায়। স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোগ পরিবর্তনের মাধ্যমে সহজেই এই ক্ষত এড়ানো যায়। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ঘটছে। এখানে কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কারেরা রোগীর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, দেখাশোনা ও বিশ্লেষণ করতে পারেন। যদি সঠিক তথ্য ও সঠিক প্রযুক্তি সঠিক স্থানে সঠিক লোকের কাছে পৌঁছানো যায়, তবে এখানে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা জোগানো সম্ভব।

গরিবদের জন্য চাই আধুনিক চিকিৎসা

প্রথম বিষয়ভিত্তিক অধিবেশনে আলোচ্য বিষয় ছিল : ‘ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি’। মুখ্য আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল ফিজিক্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সিদ্দিক-ই-রববানি। নির্ধারিত আলোচক ছিলেন টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট অব হাঙার অর্থপেডিক অ্যান্ড গ্রুপের ডিরেক্টর মোস্তাফিজুর রহমান।

সীমিত সম্পদ দিয়ে অধ্যাপক রববানি ১০ বছরের সুবিধাবঞ্চিত একটি বালিকার জন্য তৈরি করেছেন একটি কৃত্রিম হাত। তিনি একটি পোশাকের দোকান থেকে একটি ম্যানিকুইনের হাত কিনে আনেন। এর ওপর পনের দিন একটানা কাজ করেন। তার তৈরি এই হাতটি হয়ে ওঠে এই মেয়েটির জন্য সহায়ক। তার মা রাস্তার ঝাড়ুদার। তার মেয়ের জন্য এই হাত পেয়ে এখন মহাখুশি। একটি কৃত্রিম হাত কিনতে সাধারণত ২২ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। আর ড. রববানি এই হাতটি তৈরি করেছেন মাত্র দেড় হাজার টাকা খরচ করে। তিনি তার বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিভাগে এ ধরনের যেসব কাজ হচ্ছে, তার বিবরণ তুলে ধরেন সাবলীল উপস্থাপনায়। তার কথা হচ্ছে, প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে গরিব সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য কম খরচে আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ পৌঁছে দিতে হবে।

এরপর মোস্তাফিজুর রহমান অধ্যাপক রববানির চেতনা ও ত্যাগী ভূমিকার প্রশংসা করে বক্তব্য রাখেন।

দূর করতে হবে প্রযুক্তি ব্যবহারের বাধা

দ্বিতীয় বিষয়ভিত্তিক কারিগরি অধিবেশনে আলোচ্য বিষয় ছিল : ‘স্বাস্থ্যসেবা মূল্যায়নে যোগাযোগ বাধা’। এতে মুখ্য আলোচক ছিলেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যোগাযোগ নীতিবিশ্লেষক ও গবেষক মুরালি শানমুগাভেলান। নির্ধারিত আলোচক ছিলেন টেলিমেডিসিনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. সিকদার এম. জাকির।

মুরালি শানমুগাভেলান বলেন- প্রযুক্তির প্রাপ্যতাই বড় কথা নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে জনগণের দোরগোড়ায় যথাযথ ভাষা ও প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার পৌঁছানো। মানুষ যেকোনো সেবাই গ্রহণ করবে না, যদি না তা নির্ভরযোগ্য হয়। এ জন্য যোগাযোগপ্রযুক্তি ব্যবহারে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আচরণগত বাধা দূর করতে হবে।

ড. সিকদার এম. জাকির বলেন- টেলিমেডিসিন, মোবাইল-হেলথ তথা এম-হেলথের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় নিতে হলে প্রয়োজন যথাযথ নীতি ও প্রক্রিয়া। তিনি মোবাইলকে যন্ত্র হিসেবে তিন ভাগে ভাগ করেন : কনজ্যুমার, ক্লিনিক্যাল ও অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ। এতে সভাপতিত্ব করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহরুখ মহিউদ্দিন।

চাই সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা

তৃতীয় বিষয়ভিত্তিক কারিগরি অধিবেশনে আলোচনার নির্ধারিত বিষয় ছিল : ‘ই-স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব’। মুখ্য আলোচক ছিলেন গ্লোবাল হেলথ অ্যান্ড টেকনোলজি অশোকার সিনিয়র অ্যাডভাইজার ডেভিড অ্যাইলওয়ার্ড। নির্ধারিত আলোচক ছিলেন ‘মায়ের হাসি’র প্রজেক্ট ডিরেক্টর ও ‘এনডেঞ্জার্ড হেলথ’-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. আবু জামিল ফয়সল। সভাপতিত্ব করেন যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস ইউনিভার্সিটি ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার কিম্বারলি রুক।

ডেভিড অ্যাইলওয়ার্ড বলেন- বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো ও এবং বিশ্বব্যাপী তা ছড়িয়ে দেয়ায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতায় আইসিটি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যসেবা সহজেই সম্প্রসারিত করা সম্ভব। আনা যায় ইতিবাচক পরিবর্তন। স্বাস্থ্যসেবায় পরিবর্তন আনার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক উদ্ভাবন। সেই সাথে প্রয়োজন জনগণ, গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মী, গ্রামীণ ক্লিনিক, কলসেন্টার/ইনফরমেশন সেন্টার/মেডিক্যাল সেন্টার, চিকিৎসক ও প্রসবকেন্দ্র/হাসপাতালের মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আইসিটির ব্যবহারে আগ্রহী করে তুলতে হবে।



ড. আবু জামিল ফয়সল এ অধিবেশনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন এবং বলেন, বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি প্ল্যাটফরম গড়ে তোলার জন্য বেসরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা অপরিহার্য। সবশেষে অধিবেশনের সভাপতি কিম্বারলি রুক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বক্তব্য রাখেন।

প্রয়োজন রোগীর পর্যাপ্ত তথ্য

চতুর্থ বিষয়ভিত্তিক অধিবেশনের আলোচ্য বিষয় : ‘রোগী ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার ও ব্যবসায়িক চাহিদা’। মুখ্য আলোচক ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশী কাজী আই আহমেদ, যিনি ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে আলোচনায় অংশ নেন এবং দর্শকদের প্রশ্নের জবাব দেন। তার স্থানীয় প্রতিনিধি এবং এইচপি সফটওয়্যারের সিনিয়র স্ট্র্যাটেজিস্ট শেখ মোহসীন উদ্দিন সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করন। নির্ধারিত আলোচক ছিলেন দু’জন : অবসরপ্রাপ্ত মে. জে. অধ্যাপক আমির আলী এবং নায়লা হাসান।

কাজী আই আহমেদ বলেন- চিকিৎসকদের জানা উচিত রোগী সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত। এসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একজন চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করবেন। সেজন্য রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে সহজে যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকা দরকার।

উল্লেখ্য, কাজী আহমেদ রোগীর রেকর্ড ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সফটওয়্যার উদ্ভাবন করেছেন। এই সফটওয়্যার যুক্তরাষ্ট্রের ৪ শতাধিক হাসপাতালে ব্যবহার হচ্ছে। তিনি বক্তব্যে তার সফটওয়্যারের বর্ণনা তুলে ধরেন।

ব্যাপক স্বাস্থ্যসেবা তথ্যব্যবস্থা

পঞ্চম বিষয়ভিত্তিক কারিগরি অধিবেশনের আলোচ্য বিষয় ছিল : ‘নতুন সেবা নকশা ও নীতি প্রণয়নের জন্য স্বাস্থ্য-উপাত্ত প্রমিতকরণ’। এতে মুখ্য আলোচক ছিলেন টেলিমেডিসিন নিয়ে কর্মরত ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক মেডিক্যাল ইনফরমেটিকস কোম্পানির প্রধান নির্বাহী আলী এইচ রাশিদী। নির্ধারিত আলোচক ছিলেন চট্টগ্রামের এশিয়া মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফাহিম হোসেন। সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব একেএম অশরাফুল ইসলাম।

এ অধিবেশনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ হলো- বাংলাদেশকে এর স্বাস্থ্যসেবার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা নির্ণয় করে একটি ব্যাপকভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা তথ্যব্যবস্থার জন্য তৈরি হতে হবে। কার্যকর উপায়ে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।

ড. আলী এইচ রাশিদী বলেন- বাংলাদেশকে এদেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাওয়ার যোগ্য একটি মেট্রিক্স গড়ে তুলতে হবে। কারণ স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি দ্রুত আন্তর্জাতিক হয়ে উঠছে। খুঁজতে হবে কোথায় কোথায় এর ঘাটতি রয়েছে এবং এই ঘাটতি কী করে কমিয়ে আনা যায়। কাজটি বাংলাদেশের জন্য সহজ নয়। তবে এখন থেকে এ কাজ শুরু না করলে ভবিষ্যতে বিপদে পড়তে হবে।

অধ্যাপক ফাহিম হোসেন বলেন- ডাটা এন্ট্রি বিবেচনায় বাংলাদেশে কোনো মান নেই। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যে ডাটা বিনিময় হয়, তা ব্যয়বহুল ও সাময়িকভিত্তিক। এ ব্যাপরে কোনো নীতি নেই।

এসএম আশরাফুল ইসলাম বলেন- পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়া কেউ একটি পাবলিক হেলথ সিস্টেম গড়ে তুলতে পারেন না। আমরা বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি দেশে ই-হেলথ গড়ে তুলতে।

টেলিমেডিসিন : অমিত সম্ভাবনা

ষষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক কারিগরি অধিবেশনের বিবেচ্য ছিল : ‘টেলিমেডিসিনে সরাসরি চিকিৎসা পরামর্শের গুরুত্ব’। এ অধিবেশনের মুখ্য আলোচক ছিলেন ড. অ্যালেন বি. ল্যাবরিখ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের সহকারী অধ্যাপক এবং একই সাথে জন হপকিনস বাংলাদেশ লিমিটেডেরও পরিচালক। নির্ধারিত আলোচক ছিলেন দু’জন : ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের মাহরুখ মহিউদ্দিন এবং টেলিমেডিসিন রেফারেন্স সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ড. সিকদার এম. জাকির। এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন জন হপকিনস ইউনিভার্সিটি ব্লুমবাগ স্কুল অব পাবলিক হেলথের নলেজ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশন প্রজেক্ট টিম লিডার কিম্বারলি এ. রুক।

আলোচনার পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে আসে, বাংলাদেশে টেলিমেডিসিনের অমিত সম্ভাবনা বিরাজ করছে। সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও টেলিমেডিসিন বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন আনতে পারে। প্রযুক্তির সাহায্যে সব সময় যথাযথ রোগ নির্ণয় সম্ভব না-ও হতে পারে। তবুও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

মুখ্য আলোচক ড. অ্যালেন ল্যাবরিখ বলেন- টেলিমেডিসিন হচ্ছে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে দূর থেকে স্বাস্থ্যসেবা জোগানো। এটি দূরত্বের বাধা অপসারণ করে চিকিৎসাসেবায় প্রবেশে সুযোগের উন্নয়ন ঘটাতে পারে। সঙ্কট সময়ে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা জুগিয়ে মানুষের জীবন বাঁচাতে টেলিমেডিসিন সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এসব বিবেচনায় বাংলাদেশে টেলিমেডিসিনের অমিত সম্ভাবনা বিরাজ করছে। চিকিৎসক তার অফিস থেকে টিভির পর্দার সামনে বসে দূরের কোনো হাসপাতালে রোবটের সাহায্যে অপারেশনের কাজ তদারকি করতে পারেন। এভাবে চিকিৎসকেরা তাদের অফিসে এমনকি বাড়িতে বসে রোগী পরীক্ষা করতে পারেন। এটি শুধু জন হপকিনসেই নয়, নেপালেও এমনটি সম্ভব হচ্ছে।

ড. জাকির এম. সিকদার বলেন- টেলিমেডিসিনে বাংলাদেশও খুব বেশি পিছিয়ে নেই। গত পাঁচ বছরে আমাদের কেন্দ্র ১ কোটি ১০ লাখ টেলিফোন কন্সালটেশনের সুযোগ দিয়েছে। আর মাত্র ৪০ শতাংশ রোগীকে পাঠানো হয়েছে ডাক্তারের কাছে, এর ৭ শতাংশকে ভর্তি করতে হয়েছে হাসপাতালে।

মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, টেলিমেডিসিনের বড় ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে মানসিক চিকিৎসায়।

প্রয়োজন বিজনেস মডেল

সপ্তম বিষয়ভিত্তিক অধিবেশনের বিবেচ্য বিষয় ‘ই-হেলথ ও এম-হেলথের জন্য ব্যবসায় মডেল’। মুখ্য আলোচক ডি-নেটের নির্বাহী পরিচালক ড. অনন্য রায়হান। তিনি তার বক্তব্যে বাংলাদেশে চলমান এম-হেলথ তথা মোবাইল হেলথ প্রকল্পের (মোবাইল অ্যালায়েন্স ফর ম্যাটারনাল অ্যাকশন) মডেল উপস্থাপন করেন। সেই সাথে তিনি বর্ণনা দেন কী করে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এম-হেলথ সলিউশন বাস্তবায়নে বিজনেস মডেল গড়ে তুলতে হয়। উল্লিখিত এই প্রকল্প এখন বাংলাদেশের চারটি জেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।

নির্ধারিত আলোচক নায়লা হাসান আলোচনায় অংশ নেন। এ অধিবেশনের সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ’র অধ্যাপক সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

স্বাস্থ্যসেবা মূল্যায়নে আইসিটি

অষ্টম বিষয়ভিত্তিক অধিবেশনের আলোচ্য বিষয় ছিল ‘স্বাস্থ্যসেবা নজরদারি ও মূল্যায়নে আইসিটি’। মুখ্য আলোচক ছিলেন স্বাস্ব্য ও প্রযুক্তি সম্পর্কিত বিশেষজ্ঞ কিম্বারলি এ. রুক।

ড. কিম্বারলি একটি কল্পিত উদাহরণ তুলে ধরেন, কী করে কিছু সহজ ধাপের মাধ্যমে আইসিটি ব্যবহার করে গোটা স্বাস্থ্যসেবার নজরদারি ও মূল্যায়ন সম্পন্ন করা যায়। তিনি বলেন, এ কাজটি সম্পন্ন করা যায় সফটওয়্যার ও কমপিউটার ব্যবহার করে। আর এর জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রযুক্তি এখন আমাদের হাতের কাছেই আছে। বেশ কয়েকটি প্রকল্পে কী করে স্বাস্থ্যসেবার নজরদারি ও মূল্যায়নে আইসিটির ব্যবহার হচ্ছে তাও তুলে ধরেন।

নির্ধারিত আলোচক এমপাওয়ার হেলথের প্রধান নির্বাহী ও প্রতিষ্ঠাতা মৃদুল চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্যসেবা নজরদারি ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পৃথিবী এখন অনেকটা পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে। এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ব্র্যাকের স্বাস্থ্য কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক ড. কাওসার আফসানা। তিনি বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে স্টেকহোল্ডারের মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন, যাতে করে এরা এদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে বিভিন্ন সমাধান খুঁজে পায়।

হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়ন দরকার

নবম বিষয়ভিত্তিক অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’। মুখ্য আলোচক ছিলেন হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ রুবাইউল মোর্শেদ। নির্ধারিত আলোচক ছিলেন ড. অ্যালান বি. ল্যাবরিখ। সভাপতিত্ব করেন ড. ইশতিয়াক মান্নান।

রুবাইউল মোর্শেদ বলেন- ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে স্ব্যাস্থ্যসেবা সরবরাহের উন্নততর অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে স্বাস্থ্যসেবা এখনো থেকে গেছে গরিব মানুষের নাগালের বাইরে। এ সমস্যা কাটানোর জন্য শুধু প্রয়োজন শক্তিশালী সরকারি নীতি। আর ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা উন্নত করা যাবে না, যদি না হাসপাতালগুলোতে রোগী সম্পর্কিত পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত না থাকে। তিনি তার বক্তব্যে বিদেশে চিকিৎসার ভালো-মন্দ তুলে ধরেন।

ড. অ্যালান বি. ল্যাবরিখ বলেন- বাংলাদেশকে তথ্য-উপাত্তভিত্তিক একটি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সেই সাথে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশ নিজেকে কোন অবস্থানে দেখতে চায়।

এ অধিবেশনে ড. ইশতিয়াক মান্নান বলেন- স্বাস্থ্যসেবায় আইসিটির ব্যবহার করে আমরা আমাদের সুযোগের সম্পসারণ ঘটাতে পারি। আমরা আইসিটির ব্যবহার করতে পারি অত্যন্ত সৃজনশীল ও উদ্ভাবনীমূলক উপায়ে।

আইসিটি রোডম্যাপ অপরিহার্য

সমাপ্তি অধিবেশনে আলোকপাতের বিষয় ছিল ‘স্বাস্থ্যসেবায় আইসিটি : বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত পথরেখা’। মুখ্য আলোচক ছিলেন ড. অ্যালান বি. ল্যাবরিখ। নির্ধারিত আলোচক ছিলেন ডেভিড অ্যাইলওয়ার্ড ও মৃদুল চৌধুরী।

এ অধিবেশনে দেশী-বিদেশী সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেন- বিশ্বে আইসিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবায় যথাযোগ্য স্থান করে নেয়ার সুযোগ হারাতে পারে, যদি না দেশটি যথাযথ কার্যকর একটি নীতি নিয়ে এগিয়ে যেতে না পারে। তারা বলেন, অতীতে বাংলাদেশ এ খাতে উৎকর্ষ প্রদর্শনের বেশ কিছু সযোগ পেয়েও সময়মতো পদক্ষেপ না নেয়ার কারণে তা কাজে লাগাতে পারেনি। তারা মনে করেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের জন্য একটি আইসিটি নীতি ও রোডম্যাপ প্রণয়ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

ড. ল্যাবরিখ বলেন- বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। এরা জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সেখানে নবজাতক ও মাতৃমৃত্যু কমানো সম্ভব হয়েছে। তাই বাংলাদেশে আইসিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা নীতি প্রণয়ন প্রয়োজন।

ডেভিড অ্যাইলওয়ার্ড বলেন- আইসিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা নীতি এ দেশে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তনের সুযোগ এনে দেবে। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব নজরুল ইসলাম খান বলেন, আইসিটি ও স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক এই আয়োজন সময়োপযোগী। এ ব্যাপারে একটি ফোরাম গঠন প্রয়োজন। ড. অনন্য রায়হান সুপারিশমালার সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন। সমাপ্তি অধিবেশনের সভাপতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব হুমায়ুন কবীর বলেন- সরকার বিভিন্ন খাতে আইসিটি ব্যবহারে অনেক উদ্যোগ নিয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতেও এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

কজ ওয়েব
পত্রিকায় লেখাটির পাতাগুলো
লেখাটি পিডিএফ ফর্মেটে ডাউনলোড করুন
লেখাটির সহায়ক ভিডিও