Comjagat.com-The first IT magazine in Bangladesh
  • ভাষা:
  • English
  • বাংলা
হোম > লেখা > গতি-প্রগতি-অধোগতি
লেখক পরিচিতি
লেখকের নাম: আবীর হাসান
মোট লেখা:১৪২
লেখা সম্পর্কিত
পাবলিশ:
২০১২ - ফেব্রুয়ারী
তথ্যসূত্র:
কমপিউটার জগৎ
লেখার ধরণ:
ফিচার
তথ্যসূত্র:
ফিচার
ভাষা:
বাংলা
স্বত্ত্ব:
কমপিউটার জগৎ
রেটিং: ০ মন্তব্য:০
গতি-প্রগতি-অধোগতি

একবিংশ শতাব্দীর প্রথম যুগের শেষ পর্বে এসে একটা প্রশ্ন স্বভাবতই অনুসন্ধিৎসু মনকে নাড়া দেয়। প্রশ্নটা হলো- আগের শতাব্দীর প্রথম যুগের তুলনায় এ শতাব্দীতে মানবসভ্যতায় অবদান রাখা প্রযুক্তি উদ্ভাবন সংখ্যায় কিংবা মানে কি অকিঞ্চিৎকর? হ্যাঁ, বিংশ শতাব্দীর প্রথম এক যুগে আসলে এমন কিছু উদ্ভাবন হয়েছিল, যা মানবসভ্যতাকে এক ধাক্কায় অনেকটা এগিয়ে দিয়েছিল। অ্যারোপ্লেন দিয়ে শুরু করেন অনেকে। অবশ্যই এটা একটা মাইলফলক। তবে পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, জীববিদ্যা ও যন্ত্রবিজ্ঞানেও হয়েছিল অভাবিত সব উদ্ভাবন এবং উদ্ভাবনগুলো ঘটেছিল নতুন পৃথিবীতে অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। টুকরো টুকরো বিষয় অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পায় বটে, তবে সবরকম যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন কৃৎকৌশলের উদ্ভাবন ঘটেছিল তাকে বৈপ্লবিকই বলতে হবে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য হচ্ছে গাড়ির ইঞ্জিনের প্রযুক্তির উন্নতি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উপায় উদ্ভাবন, টেলিগ্রাফিক যোগাযোগের বিস্তার, নানারকম মেকানিক্যাল ডিভাইস উদ্ভাবন, মারণাস্ত্রের উন্নতি ইত্যাদি অনেক কিছুরই উল্লেখ করা যায়।

সে তুলনায় একবিংশ শতাব্দীর প্রথম যুগটাকে যেনো অনেকটা ম্রিয়মাণ মনে হয় চর্মচক্ষে। চর্মচক্ষে কথাটা বিশেষভাবে বললাম এ কারণে যে, এই সময় এমন অনেক কিছু হয়েছে বা হচ্ছে যা সরাসরি দেখার নয়, অনেকটাই অনুভব করার ব্যাপার। বিষয়টা পুরোপুরি হয়তো এমনও নয়- কারণ এখন উদ্ভাবিত প্রযুক্তি দ্রুত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে এমনভাবে যে সবাই পরিবর্তিত বিষয়গুলোকে খুব একটা অভাবনীয় মনে করছে না। ধরুন, কমপিউটারের কথাই। এর বহিরাঙ্গে অর্থাৎ মনিটরে-কেসিংয়ে কতটা পরিবর্তন হয়েছে। হয়েই চলেছে। ভেতরের বিষয়গুলোকেও অগুরুত্বপূর্ণ মনে করার কিছু নেই। ইন্টেল আর এএমডি কত ধরনের মাইক্রোপ্রসেসর বানিয়েছে তার তালিকাটা একবার করে দেখুন। ওই যে মুর’স ল’ যেটা এখনও জারি আছে। আর এর সাথে বাংলাদেশী সায়ীফ সালাহউদ্দিন ফেরোইলেকট্রিক উপাদানের ট্রানজিস্টর দিয়ে চিপ তৈরি করে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অভিনব পন্থা উদ্ভাবন করেছেন অতিসম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায়।

এ যুগের উদ্ভাবনের তালিকাটা আর একটু লক্ষ করা যায় অ্যাপলকে সামনে রেখে। অ্যাপলের উদ্ভাবনগুলোর মধ্যে আইফোন, আইপ্যাড এবং আইপড যুগান্তকারী নিঃসন্দেহে। সর্বশেষ অ্যাপল তাদের উদ্ভাবনী তালিকায় যোগ করতে যাচ্ছে আইবুক। এই আইবুক আসলে ই-টেক্সট বুক। আইপ্যাডের জন্য পাঠ্যপুস্তক এবং অন্য যেকোনো ধরনের বই ইলেকট্রনিক্যালি প্রকাশ করা যাবে এ প্রযুক্তির মাধ্যমে। প্রযুক্তির এই দিকটায় অ্যাপল কিছুটা পিছিয়ে ছিল। ই-বুক রিডার নিয়ে অনেকটা একচ্ছত্র অবস্থানে ছিল আমাজন। বিশ্বের বৃহত্তম অনলাইন প্রকাশক এবং বই বিপণনকারী আমাজনের প্রযুক্তিটার নাম কাইউল। এছাড়া বনেদী প্রকাশনা সংস্থা বার্নস অ্যান্ড নোবলসের আছে ন্যুক নামের একটি প্রযুক্তি। কিন্তু যত যাই হোক অ্যাপলের প্রযুক্তির উন্নয়ন অন্য একটি মাত্রা সংযোজন করবে, যেমন করেছে অন্যান্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে।

অ্যাপল কিন্তু প্রযুক্তির একচেটিয়া সাড়া সৃষ্টি করতে পারেনি। প্রতিদ্বন্দ্বীও আছে তার। কমপিউটার থেকে শুরু করে আইপ্যাড পর্যন্ত। এসব প্রযুক্তিরও জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বাড়ছে। আমরা খুব ভালোভাবেই লক্ষ করছি মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে আসতে শুরু করেছে অভাবনীয় পরিবর্তন। শুধু সেট এবং তার অপারেটিং সিস্টেমে নয়, আইকনভিত্তিক নানারকম অ্যাপ্লিকেশনকে করা হয়েছে সুবিন্যস্ত।

ইন্টারনেটের যোগাযোগ এখন বিগত যুগের তুলনায় অনেক উন্নত। বলা যায়, গতি থেকে প্রগতিতে উত্তরণ ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো ক্রমাগত আধুনিক হচ্ছে। গুগল, ইয়াহু, জি-মেইলের মধ্যে একটা প্রবল প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সাম্প্রতিককালে বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে সামাজিক নেটওয়ার্কের শক্তিমত্তা। বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে পরিণত হয়েছে এ নেটওয়ার্কগুলো। পিছিয়ে পড়া মধ্যপ্রাচ্যের মরুপ্রান্তর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিট পর্যন্ত এর শক্তি প্রসারিত।

এসব ছাড়িয়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি গত প্রায় এক যুগে অবদান রেখেছে বিজ্ঞান গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে। এর মধ্যে যেমন রয়েছে নাসার মতো মহাকাশ গবেষণা সংস্থা, যেমন রয়েছে সার্নের মতো পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাগার, তেমনি রয়েছে জেনম প্রজেক্ট এবং স্টেম সেল গবেষণা প্রকল্পগুলো। রোবটিক্স এবং আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ক্ষেত্রে সবিশেষ অবদান রেখেছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি। আগে মেকানিক্যাল প্রযুক্তিনির্ভর রোবটিক্স উন্নত হচ্ছিল খুবই ধীরগতিতে, কিন্তু কমপিউটারের উন্নত প্রযুক্তি এর উন্নয়নের গতিকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিকে ক্রমাগত উন্নত করেছে চলেছে-এটি হচ্ছে ন্যানো টেকনোলজি অর্থাৎ ‘ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রযুক্তি’ গবেষণা। এই গবেষণা তথ্যপ্রযুক্তিকেই ভিন্ন সূক্ষ্মমাত্রায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা জাগিয়েছে। কিন্তু যত দ্রুত এসব প্রযুক্তি ব্যবহারযোগ্য হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। তবে সম্ভাবনা যে বেড়েছে তাতে সন্দেহ নেই। আর তথ্যপ্রযুক্তি ক্রমাগত নতুন নতুন ক্ষেত্রকে অধিগ্রহণ করছে এবং তা হচ্ছে অভাবিত মাত্রায়। এখন যেকোনো উন্নত প্রযুক্তি তথ্যপ্রযুক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত কি না, সেটাই দেখতে বা বুঝতে চায় মানুষ।

কিন্তু বুঝলেও অনেকেরই মনে একটা আক্ষেপ আছে বিগত শতাব্দীর প্রথম দশক বা প্রথম যুগের মতো স্বর্ণগর্ভা নয় একশ’ বছর পরের সময়টা। এর একটা কারণ অনেক প্রযুক্তিরই সম্ভাবনার পর্যায়ে থেকে যাওয়ায় আর একটা কারণ হয় বিশ্বব্যাপী চলা অর্থনৈতিক অব্যবস্থা (মন্দা) এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। মনে রাখা দরকার একশ’ বছর আগে পুরো পৃথিবীই ছিল ঔপনিবেশিকদের করতলগত। মানুষের রাজনৈতিক অধিকার যেমন কম ছিল, তেমনি কম ছিল চাহিদা এবং সামাজিক সচেতনতা। আগের শতাব্দীটা বিশ্ববাসীকে তেমন একটা স্বপ্ন দেখায়নি, ফলে মানুষের সামনে যে উদ্ভাবনগুলো এসেছিল সেগুলোই ছিল অভূতপূর্ব এবং বিস্ময়কর। কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীর প্রথম যুগের মানুষের বিস্ময় উদ্রেক করা তেমন সহজ নয়, কারণ ক্রমাগত গতির মধ্য দিয়ে চলতে হচ্ছে তাদের। এই সময় তাদের জন্য মোহাবিষ্ট হওয়ার চেয়ে মোহভঙ্গের অনেক ব্যাপারও আছে। যেমন উন্নত প্রযুক্তির বিপরীতে যে ধরনের আদর্শ ও মূল্যবোধ তারা আশা করেছিল সে ধরনের আশা তারা দেখতে পায়নি। বিশেষত তারা দেখতে পেয়েছে বিশ্বের রাজনীতি ও কূটনীতিতে এবং শাসকের ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার স্বার্থে মানবিক মূল্যবোধগুলোকে জলাঞ্জলি দিতে। এমনকি যুদ্ধের মতো নৃশংস ব্যাপার চাপিয়ে দিতে। যুদ্ধ যে মানবতার বাইরের বিষয় হাইটেক যুদ্ধ দিয়ে তাও প্রমাণ করেছে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পশ্চিমা শক্তিগুলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক এই শক্তির হাতে যেমন রয়েছে উন্নত সব প্রযুক্তি ব্যবহারের অমিত সম্ভাবনা, তেমনি কিন্তু দেখা যাচ্ছে কূপমন্ডূক প্রবণতাও। অনেক ক্ষেত্রেই প্রাচীন মূল্যবোধ দিয়ে এরা চেষ্টা করছে নতুন যুগের প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে। এই লেখা যখন লিখছি তখন মার্কিন কংগ্রেসে উত্থাপিত হয়েছে প্রটেক্ট ইন্টেলেকচুয়ালি প্রপার্টি অ্যাক্ট (পিপা) এবং স্টপ অনলাইন পাইরেসি অ্যাক্ট (সাপা) বিল। এ বিল দুটিকে আপাতদৃষ্টে নিরীহ বা উপযোগী মনে হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের অনেক অনলাইন বাণিজ্যিক সংস্থাই বলছে বিল দুটি জ্ঞানবিস্তারের পথে অন্তরায় তৈরি করবে। কারণ অনলাইন ব্যবসায় প্রতিহিংসাপরায়ণতা বাড়বে। প্রতিযোগী সাইটগুলো একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে পারবে। মানবাধিকারকর্মীরাও এর বিরোধিতা করছেন। তারা বলছেন মানুষের জানার অধিকার এবং শিল্পের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হবে এ আইন দুটি পাস হলে। নানারকমে এর প্রতিবাদ হয়েছে। তবে সবচেয়ে অভিনব কায়দায় প্রতিবাদ জানিয়েছে উইকিপিডিয়া। ১৮ জানুয়ারি রাতদিন উইকিপিডিয়া ইংরেজি সংস্করণের পাতাগুলো কালো করে রাখা হয়। এ বিষয়ে উইকিপিডিয়ার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জিমিওয়েলস বিবিসিকে বলেছেন, ‘ওই আইনগুলোতে এমন অনেক বিষয় আছে, যার সাথে পাইরেসির কোনো সম্পর্ক নেই।’ এছাড়া উইকিপিডিয়া একটি প্রশ্ন রাখে সাধারণ ব্যবহারকারীদের প্রতি। যাতে বলা হয়- ‘জ্ঞানের পথের প্রতিবন্ধকতা কি আপনি মেনে নেবেন?’

আসলে এই যুগের সমস্যাই এটা- একদিকে জ্ঞানের বিস্তার ঘটছে প্রযুক্তির কল্যাণে, অন্যদিকে শতাব্দীপ্রাচীন আইন-কানুন, মূল্যবোধের দোহাই দিয়ে জ্ঞানের সেই স্বাভাবিক প্রবহমানতাকে বিঘ্নিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কখনও কখনও কেউ প্রশ্ন তুলছে নিরাপত্তা নিয়ে।

সম্ভবত জ্ঞানের পথে চলার কঠিন পন্থার ক্লেশ সহ্য করতে না চাওয়া থেকেই এ ধরনের সমস্যার উদ্ভব ঘটছে। খুব সহজ একটা উদাহরণ দেয়া যায়। গাড়ির উদ্ভাবনের যুগে দুটো সমস্যা ছিল- রাস্তা না থাকা এবং জ্বালানির সহজপ্রাপ্যতা না থাকা। কিন্তু ক্রমে ক্রমে রাস্তাও তৈরি হয়েছে, আর সেই জ্বালানির জন্য তো এখন বিশ্ব রাজনীতিই বদলে গেছে। কিন্তু তাই বলে গাড়ি ব্যবহার বন্ধ করতে পেরেছে কেউ।

এই শতাব্দীতে ধীরে ধীরে হলেও তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞান এবং সব ধরনের প্রযুক্তির সহায়ক শক্তি হয়ে উঠেছে। সাইবারনেটিকসের নিয়ম অনুযায়ীই হচ্ছে এটা। এটা সত্যি এবং কঠিন পন্থা তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এ পথেই চলতে হবে।

সাম্প্রতিককালে বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে সামাজিক নেটওয়ার্কের শক্তিমত্তা। বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে পরিণত হয়েছে এ নেটওয়ার্কগুলো। পিছিয়ে পড়া মধ্যপ্রাচ্যের মরুপ্রান্তর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিট পর্যন্ত এর শক্তি প্রসারিত।

একবিংশ শতাব্দীর প্রথম যুগের মানুষের বিস্ময় উদ্রেক করা তেমন সহজ নয়, কারণ ক্রমাগত গতির মধ্য দিয়ে চলতে হচ্ছে তাদের। এই সময় তাদের জন্য মোহাবিষ্ট হওয়ার চেয়ে মোহভঙ্গের অনেক ব্যাপারও আছে। যেমন উন্নত প্রযুক্তির বিপরীতে যে ধরনের আদর্শ ও মূল্যবোধ তারা আশা করেছিল সে ধরনের আশা তারা দেখতে পায়নি।

কজ ওয়েব

ফিডব্যাক : abir59@gmail.com
পত্রিকায় লেখাটির পাতাগুলো
লেখাটি পিডিএফ ফর্মেটে ডাউনলোড করুন
লেখাটির সহায়ক ভিডিও
অনুরূপ লেখা