উত্তরসূরীর শ্রদ্ধাঞ্জলি
৩রা জুলাই ২০০৩ সালের ভোর চারটা। শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ) এবং ‘মাসিক কমপিউটার জগৎ’-এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মো: আবদুল কাদের আমাদের প্রাণপ্রিয় কুটি কাকা পৃথিবী ছেড়ে চিরবিদায় নেন। তাঁর এ মহাপ্রয়াণে আইসিটি (তথ্য এবং যোগাযোগ ও প্রযুক্তি) জগৎ, তার পরিবারের যতটুকু ক্ষতি হয়েছিল, তারচেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি হয়েছিল আমাদের পরিবারটির। মাতৃ-পিতৃহীন আমাদের তিন ভাই-বোনকে তিনি পিতার চেয়েও বেশি মমতায় আগলে রেখেছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে আমরা সত্যিকার অভিভাবকহীন হয়ে গেলাম।
পুরান ঢাকার প্রায় শিক্ষা বিবর্জিত পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই মানুষটির শিক্ষার প্রতি অনুরাগ বিশেষত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি তাঁর তীব্র আকর্ষণ ছিল এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় বাংলা ভাষায় প্রথম প্রকাশিত ছোটদের বিজ্ঞান পত্রিকা ‘টরেটক্কা’ সম্পাদনা করে যার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। এ প্রসঙ্গে এক স্মৃতিচারণমূলক লেখায় ড. মুহাম্মদ ইব্রাহীম স্যার উল্লেখ করেছেন, ‘হাফপ্যান্ট পরা দু’টি ছেলে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। একজন কাদের, অন্যজন ভূঁইয়া ইকবাল। ওদের পরিচয় ‘টরেটক্কা’ নামে কিশোর বিজ্ঞান পত্রিকার ওরা সম্পাদক। ... কাদের তার নিত্যনতুন আইডিয়া আর সেগুলোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমাদের চমৎকৃত করে চললো। সেই হাফপ্যান্ট পরা আইডিয়া ভর্তি কিশোরের ছবিটিই মনের মধ্যে গাঁথা হয়ে রইল। পরে সে যখন যা করছে, মনে হতো ঐ কিশোরটিই করছে।’
১৯৭৩ সালে আমার মা এ পরিবারের বউ হয়ে এসে তার একমাত্র দেবরের ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। মা’র কাছে গল্প শুনেছি, রসায়নের বই পড়ে একবার নাকি কুটি কাকা হেয়ার রিমুভার তৈরি করে এনে সবাইকে টেস্ট করতে দিলেন। সেই হেয়ার রিসুভার এমনই জ্বালা যন্ত্রণা সৃষ্টি করল যে তাকে স্ক্রিন রিমুভার বলাই ভাল। পরবর্তীতে আমার বাবাকে অনুসরণ করে জুতার ফিতা তৈরির কারখানা করলেন, স্টেইনলেস স্টীলের ফ্যাক্টারী বানালেন, সবকিছুই হেয়ার রিমুভারের মত। বেশিদিন টিকে থাকল না।
১৯৯১ সালের মে মাসে ‘জনগণের হাতে কমপিউটার চাই’ প্রচ্ছদ প্রতিবেদন নিয়ে যাত্রা শুরু করল ‘মাসিক কমপিউটার জগৎ’। যেন সৃষ্টিশীল কোন শিল্পী বিভিন্ন মাধ্যমে নিরীক্ষা করতে করতে আসল ক্ষেত্রটি আবিষ্কার করে ফেলেছে। পরের মাসেই নীতি নির্ধারকদের ঘুম ভাঙাতে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন হল,‘ব্যর্থতা ও ট্যাক্স নয়! জনগণের হাতে কমপিউটার চাই’ সেই থেকে শুরু। ১৯৯২ সালেই কমপিউটারে বাংলা ভাষা ব্যবহারের প্রযুক্তিক সুবিধা তুলে ধরা, গ্রামের ছাত্র-ছাত্রীদের কমপিউটার পরিচিতি করার কর্মসূচি, দেশে প্রথম বারের মত কমপিউটার প্রোগ্রামিংয়ের আয়োজন করা, ১৯৯৬ সালে দেশে প্রথমবারের মত ইন্টারনেট সপ্তাহ পালনসহ জাতীয় জীবনে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার ও বিকাশে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের পাশাপাশি নিরলস কাজ করে গেছে। আজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন ও অঙ্গীকার অধ্যাপক আবদুল কাদের প্রতিষ্ঠিত তথ্যপ্রযুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎ। ‘মাসিক কমপিউটার জগৎ’-এর সেদিনের সেই ক্ষুদ্র ও নিরবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার স্বার্থকতা বলেই সংশ্লিষ্ট মহল বিশ্বাস করেন। এ দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় সংশ্লিষ্ট অনেক জ্ঞানী-গুণী প্রতিভাবান মানুষের সংস্পর্শে তিনি এসেছেন। এদের মধ্যে আব্দুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দীন, ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, ড. মুহাম্মদ ইব্রাহীম, ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ, অ্যামচেম-এর প্রেসিডেন্ট আফতাব-উল-ইসলাম, নাজীমউদ্দিন মোস্তান, মোস্তাফা জব্বার প্রমুখ। কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, দেশের তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশে যাঁরা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, কাজ করেছেন তিনি তাঁদের কাছে ছুটে গেছেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে লেখা দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে এবং কখনো বিমুখ হননি। ‘কমপিউটার জগৎ’-এর দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় সাফল্যের পেছনে তাঁদের অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করছি।
একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবেও অধ্যাপক আবদুল কাদের ন্যায়নিষ্ঠা ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের নির্বাচিত সরকারি কলেজে কমপিউটার কোর্স চালু করেন ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি বি.সি.এস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবেও নির্বাচিত হন। শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সরকারি কলেজসমূহে মেয়েদের জন্য ইংরেজি ভাষা শিক্ষা কোর্স চালু করেন। কাকতালীয়ভাবে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে আমি ইডেন কলেজে সেই কোর্সে ভর্তি হই। পরবর্তীতে কাকা সেটা জানতে পেরে আমাকে বললেন, এই কোর্সটা আমি চালু করেছি। এটা প্রথমে শুধু ছেলেদের জন্য ছিল। মেয়েরাও যেন এই কোর্স করতে পারে, তার জন্য ব্যবস্থা নিতে বলি। আমি খুব মজা পেয়েছিলাম এ কথা শুনে। আমার কুটি কাকার চালু করা কোর্সে না জেনেই আমি সুফলভোগী হয়েছি।
তাঁর দু’টি গুণের কথা না উল্লেখ করলেই নয়। ছাত্র জীবন থেকেই তিনি চমৎকার রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতেন। অন্যকিছু না করে যদি শুধু গান নিয়েই থাকতেন, হয়তো একজন ভাল শিল্পী হতে পারতেন। আর অপর গুণটি হল তাঁর তীক্ষ্ম রসবোধ। এক্ষেত্রে তিনি ঢাকাইয়াদের সহজাত বৈশিষ্ট্যের অধিকারীই ছিলেন। তাঁর ব্যক্তি জীবনের রসোক্তি বা ব্যাঙ্গোক্তিকে পুঁজি করে কত রম্য লেখা জাতীয় দৈনিকে পাঠিয়ে দিয়েছি এবং সেগুলো ছাপাও হয়েছে। তিনি এমন একটি মানুষ, মানবতা, বিজ্ঞান, সঙ্গীত, সংস্কৃতি সবকিছুর মিশেলে ব্যতিক্রমী এক প্রতিভা ছিলেন। রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা না থাকায় তাঁর অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা পাবার আশা করে কোন ধৃষ্টতা আমরা দেখাতে পারিনা। যদিও একুশে পদক প্রাপ্ত নাজীমউদ্দিন মোস্তান তাঁর মৃত্যুতে আয়োজিত স্মরণসভায় তাঁকে একুশে পদক দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করার জন্য সরকারকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু দলীয় লেবাস না থাকায় সেটা হয়তো কখনোই বাস্তবায়িত হবে না। দেশ ও জাতির জন্য নিভৃতে কাজ করে যাওয়া কর্মী পুরুষ রাষ্ট্রীয় সম্মান না পেলেও ইতিহাসে একদিন ঠিকই তাদের মূল্যায়ন হবে।
আমার পূর্বসূরি পিতার মত কুটি কাকার ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে শ্রদ্ধাজ্ঞলি অর্পণ এবং তাঁর বিদ্রেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। প্রথম আলোর দিন বদলের শপথ নিয়ে বলতে চাই, আপনার মত দেশ ও জাতির জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাব। যে মাতৃভূমি পেয়েছি, তারচেয়ে উন্নত স্বদেশ রেখে যাব পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।
ফারজানা হামিদ
সহকারী ব্যবস্থাপক
পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)
অধ্যাপক আবদুল কাদের এবং বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি আন্দোলন >> বিস্তারিত
অধ্যাপক মরহুম আবদুল কাদেরকে সম্মানিত করায় ডি-নেট ও আইসিটি মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ >> বিস্তারিত
অধ্যাপক আবদুল কাদেরের কিছু উদ্ধৃতি ও বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি >> বিস্তারিত
প্রফেসর আবদুল কাদের >> বিস্তারিত
অধ্যাপক আবদুল কাদের কবে পাবেন অবদান স্বীকৃতি >> বিস্তারিত
অধ্যাপক আবদুল কাদের ও কমপিউটার জগৎ >> বিস্তারিত
নানা চোখে অধ্যাপক মো: আবদুল কাদের >> বিস্তারিত
একজন নেপথ্যচারীর কথা >> বিস্তারিত
ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক আবদুল কাদের >> বিস্তারিত
প্রফেসর আব্দুল কাদেরের ওপর শ্রদ্ধাঞ্জলি >> বিস্তারিত
অধ্যাপক আবদুল কাদেরের কিছু উদ্ধৃতি ও বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি >> বিস্তারিত